পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির নেপথ্যে: একক জাদুদণ্ড নাকি ইতিহাসের রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডি?
ইতিহাস কোনো একক ব্যক্তির জাদুদণ্ডে রচিত হয় না। ১৯৪৭-এ পশ্চিমবঙ্গের জন্মও কোনো একজন নেতার মাস্টারস্ট্রোক ছিল না; বরং তা ছিল দিল্লি, কলকাতা এবং লন্ডনের জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ এবং লক্ষ মানুষের রক্তস্নানের এক মর্মান্তিক পরিণতি। কোনো একক ব্যক্তিকে 'পশ্চিমবঙ্গের প্রণেতা' বলা তাই ঐতিহাসিকভাবে ভিত্তিহীন।
রক্তস্নাত বাংলা: ১৯৪৬-এর দাঙ্গা এবং জনমতের মোড়বদল :
বাংলা ভাগের দাবির পেছনে কোনো একক নেতার আহ্বানের চেয়ে বেশি দায়ী ছিল সমকালীন পরিস্থিতি। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট মুসলিম লীগের ডাকা 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে' (গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং) এবং পরবর্তীতে নোয়াখালীর দাঙ্গা বাংলার হিন্দু মনস্তত্ত্বে গভীর আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেয়।
ঐতিহাসিক সুগত বসু তাঁর 'His Majesty's Opponent' গ্রন্থে দেখিয়েছেন, এই চরম সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ফলেই বাংলার ভদ্রলোক শ্রেণী এবং সাধারণ হিন্দুরা বাধ্য হয়ে দেশভাগের ধারণাকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র উপায় হিসেবে মেনে নিতে শুরু করে। অর্থাৎ, বিভাজনের দাবিটি তৈরি করেছিল পরিস্থিতি, কোনো ব্যক্তি নয়।
দাবিপত্রের নেপথ্যে - কংগ্রেসের ঐতিহাসিক প্রস্তাব ও বিভাজনের বীজ :
সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার পটভূমিতে, ১৯৪৭ সালের ৮ মার্চ দিল্লিতে আচার্য জে. বি. কৃপালনীর সভাপতিত্বে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির অধিবেশনে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে পাঞ্জাব ও বাংলা ভাগের প্রস্তাব গৃহীত হয়।
জয়া চ্যাটার্জীর 'Bengal Divided' (পৃ. ২২৭) গ্রন্থে অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়: "The campaign for the partition of Bengal was initiated not by the Hindu Mahasabha but by the Congress in March 1947. The Mahasabha joined later in April."
অর্থাৎ, বাংলা ভাগের প্রাতিষ্ঠানিক দাবি প্রথম কংগ্রেসই তুলেছিল। হিন্দু মহাসভা এই দাবির আনুষ্ঠানিক শরিক হয় এক মাস পর।
দিল্লির রুদ্ধদ্বার: মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনায় যাঁদের দেখা মেলেনি
৩ জুন ১৯৪৭। লর্ড মাউন্টব্যাটেনের উপস্থিতিতে নেহেরু, প্যাটেল, জিন্না, লিয়াকত আলী ও বলদেব সিং-এর মতো শীর্ষ নেতাদের আলোচনাতেই চূড়ান্ত হয় বাংলা ও পাঞ্জাব বিভাজনের নীলনকশা।
হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর 'উদ্বাস্তু' গ্রন্থে (পৃ. ৩৫) স্পষ্ট লিখেছেন: "সিদ্ধান্ত হইয়াছিল দিল্লীতে। শ্যামাপ্রসাদ সেখানে ছিলেন না।"
দেশভাগের এই মূল আলোচনা ও সিদ্ধান্তে হিন্দু মহাসভার কোনো উপস্থিতি বা প্রত্যক্ষ ভূমিকাই ছিল না (R.C. Majumdar, History of Freedom Movement, Vol. 3, পৃ. ৬৫৯-৬৬০)।
যুক্তবঙ্গের স্বপ্নভঙ্গ: অখণ্ড বাংলার প্রস্তাবে বিরোধিতার নেপথ্য কাহিনি :
১৯৪৭ সালের মে মাসে শরৎচন্দ্র বসু এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অবিভক্ত বাংলাকে নিয়ে 'যুক্ত স্বাধীন বাংলা' (United Sovereign Bengal) গঠনের প্রস্তাব দেন।
ঐতিহাসিক অমলেন্দু দে তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, অবিভক্ত বাংলা আদতে মুসলিম লীগের অধীনে বৃহত্তর পাকিস্তানেই পরিণত হবে। এখানে শ্যামাপ্রসাদের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ভূমিকাটি ছিল— একটি বিকল্প প্রস্তাবের (যুক্তবঙ্গ) বিরোধিতা করা এবং কংগ্রেস-সমর্থিত 'বাংলা ভাগ'-এর পক্ষে জনমত গঠনে সহায়তা করা। কিন্তু তিনি স্বয়ং এই বিভাজন নীতির রূপকার ছিলেন না।
২০ জুনের ভোটাভুটি: বঙ্গীয় আইনসভায় কংগ্রেসের সেই নির্ণায়ক ৫৫টি ভোট :
মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০ জুন বঙ্গীয় আইনসভায় বাংলা ভাগের পক্ষে-বিপক্ষে ভোটাভুটি হয়। বিভাজনের পক্ষে পড়ে ৫৮টি এবং বিপক্ষে ২১টি ভোট।
বিভাজনের পক্ষে পড়া ৫৮টি ভোটের মধ্যে কংগ্রেসের ৫৫ জন, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (CPI) ২ জন (জ্যোতি বসু ও রতনলাল ব্রাহ্মণ) এবং হিন্দু মহাসভার ১ জন (শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী) সদস্য ছিলেন।
জয়া চ্যাটার্জীর বিশ্লেষণ এখানে অমোঘ: "Without Congress votes, partition would have been defeated even if every Hindu Mahasabha member had voted for it." (পৃ. ২৫৮)
গাণিতিক বাস্তবতা হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেসের ৫৫টি ভোট ছাড়া হিন্দু মহাসভার ওই একটিমাত্র ভোটের কোনো স্বাধীন কার্যকারিতাই ছিল না।
আদর্শের টানাপোড়েন: নেতাজির সঙ্গে সংঘাত এবং অখণ্ড ভারতের কূটাভাস :
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন না। ১৯৪০ সালের কলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রাক্কালে হিন্দু মহাসভার সভায় সুভাষচন্দ্র বসুর সমর্থকরা আক্রমণ করে। সুভাষচন্দ্র হিন্দু মহাসভাকে কট্টর সাম্প্রদায়িক মনে করতেন এবং ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪০-এ Forward Bloc পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখেন: "Communalism will go only when the communal mentality goes."
সবচেয়ে বড় কূটাভাস লুকিয়ে আছে শ্যামাপ্রসাদের নিজস্ব দর্শনেই। জানুয়ারি ১৯৪৬-এর ডায়েরিতে তিনি নিজেই লিখছেন: "ভারতকে খণ্ডিত করা চলতে পারে না।" এমনকি ৩ জুনের পরেও, ৮ জুন দিল্লিতে হিন্দু মহাসভা প্রস্তাব গ্রহণ করে: "India is one and indivisible." যিনি আদর্শগতভাবে অখণ্ড ভারতের পক্ষপাতী, তাঁকে জোর করে পশ্চিমবঙ্গের একক প্রণেতা বানানো ঐতিহাসিক স্ববিরোধিতা।
শেষ কথা: ইতিহাসের আয়নায় পশ্চিমবঙ্গের প্রকৃত জন্মবৃত্তান্ত :
জয়া চ্যাটার্জীর সারগর্ভ মন্তব্যটিই এ প্রসঙ্গে শেষ কথা: "To call Mookerjee the ‘father of West Bengal’ is to ignore the complex roles played by Nehru, Patel, the Bengal Congress, and even the CPI. It was a collective, albeit tragic, decision."
পশ্চিমবঙ্গের উদ্ভব ছিল— ১৯৪৬ সালের ভয়াবহ দাঙ্গা, জাতীয় স্তরে কংগ্রেসের রণকৌশল, মুসলিম লীগের অনড় পাকিস্তান দাবি, ব্রিটিশের বিভাজন নীতি এবং র্যাডক্লিফ লাইনের কাঁটাতারের সম্মিলিত ফলাফল। এখানে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা সীমিত ছিল জনমত গঠন ও একটিমাত্র ভোট দানে। কিন্তু বঙ্গভঙ্গের নির্ণায়ক সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল কংগ্রেস হাইকমান্ড এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সম্মতিতেই।
তথ্যসূত্র
১. Joya Chatterji, Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition 1932–1947, পৃ. ২২৭, ২৫৮, ২৬০
২. R.C. Majumdar, History of Freedom Movement, Vol. 3, পৃ. ৬৫৯–৬৬০, ৬৬৪, ৬৬৫, ৬৭৩
৩. হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়, উদ্বাস্তু, পৃ. ৩৫
৪. Sugata Bose, His Majesty's Opponent: Subhas Chandra Bose and India's Struggle against Empire
৫. অমলেন্দু দে, স্বাধীন বঙ্গভূমি গঠনের পরিকল্পনা: প্রয়াস ও পরিণতি
৬. Bal Raj Madhok, Portrait of a Martyr







xh9qdy
zrbnt1