মানুষ মৃত্যুর পর স্বর্গ পাবে এই আশায় সারাজীবন অনেক চেষ্টা করে যায়। কেউ উপোস করে, কেউ দান-ধর্ম করে, কেউ তীর্থযাত্রা করে, আবার কেউ দেবতার কাছে মানত করে। স্বর্গ যেন কোনো নতুন হাউজিং সোসাইটির মতো, যেখানে একটা ছোট ফ্ল্যাট পাওয়ার জন্য পুণ্যের পয়েন্ট জমাতে হয়...
কিন্তু এক মুহূর্ত থেমে এটাও ভেবে দেখুন...
কে জানে... আমরা হয়তো আগেই স্বর্গেই বাস করছি?
সকালে ঘুম থেকে উঠেই চারপাশে একবার তাকান।
একটা বোতাম টিপলেই অন্ধকার আলো হয়ে যায়।
আরেকটা বোতাম টিপলেই পাখা ঘুরতে শুরু করে।
তৃতীয় বোতাম টিপলেই ঠান্ডা হাওয়া ঘর ভরে দেয়।
কল খুললেই জল বইতে থাকে।
গ্যাস জ্বালালেই কয়েক মিনিটের মধ্যে রান্না তৈরি।
পকেট থেকে মোবাইল বের করলেই গোটা পৃথিবী আপনার হাতের তালুতে।
হাজার কিলোমিটার দূরের প্রিয় মানুষগুলো কয়েক সেকেন্ডেই আপনার চোখের সামনে।
এত অদ্ভুত সব সুবিধা... অথচ আমরা এগুলোকে খুব সাধারণ মনে করি। এগুলো যেন আমাদের জন্মগত অধিকার।
একবার ভাবুন তো...
দুশো বছর আগের কোনো রাজা যদি আজ আপনার বাড়িতে আসত, তাহলে হয়তো সে নিজের রাজপ্রাসাদে ফিরতেই চাইত না।
সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করত —
"এটা কী?" — গরম জল!
"আর এটা?" — ঠান্ডা হাওয়া!
"এটা কী?" — গোটা পৃথিবীর খবর!
"এটা?" — দশ মিনিটে বাড়িতে খাবার!
তখন সে হেসে বলত —
"আমি সারাজীবন রাজ্য চালিয়েছি, যুদ্ধ জিতেছি, বিপুল সম্পদ পেয়েছি... কিন্তু এমন সুবিধা কখনো পাইনি।"
এটা সত্যি!
আজ একজন সাধারণ মানুষও অনেক দিক দিয়ে আগের যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজার চেয়েও বেশি "ধনী"।
তবুও...
আমরা সুখী নই।
কেন?
কারণ মানুষ যা পেয়েছে তার দাম ধীরে ধীরে কমে যায়।
এসি চলছে — আনন্দ নেই। বন্ধ হলেই কষ্ট লাগে।
মোবাইল আছে — আনন্দ নেই। নেটওয়ার্ক গেলেই মনে হয় পৃথিবী শেষ।
নিজের বাড়ি আছে — তৃপ্তি নেই। পাশের বাড়িটা বড়, তাই দুঃখ।
নিজের গাড়ি আছে — শান্তি নেই। অন্যের গাড়ি বড়, তাই চিন্তা।
অর্থাৎ মানুষ নিজের স্বর্গে দাঁড়িয়েও অন্যের স্বর্গের সাথে তুলনা করে দুঃখী হয়।
কিন্তু এই পৃথিবীতেই আরেকটা জগৎও আছে...
আজও লক্ষ মানুষ এক ঘটি জলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ায়।
লক্ষ লক্ষ পরিবারের পাকা বাড়িই নেই।
দিনে দু'বেলা খাবারের নিশ্চয়তাও নেই।
সন্তানদের স্বপ্ন স্কুলের চৌকাঠ পেরোনোর আগেই ভেঙে যায়।
গায়ে ঢাকার মতো ঠিকঠাক জামাকাপড়ও নেই।
আমরা যেগুলোকে "সাধারণ" ভাবি, সেগুলোই অন্যের কাছে জীবনের বড় স্বপ্ন।
আমাদের এসির রিমোট না পেলে রাগ হয়।
ওদের রোদ থেকে বাঁচার জন্য গাছের ছায়াটুকুও নেই।
আমরা ডায়েট চার্ট খুঁজি।
ওরা পরের বেলার খাবার কীভাবে জুটবে ভাবতে ভাবতে ঘুমায়।
তখন বোঝা যায়...
স্বর্গ আর নরক মৃত্যুর পরের কোনো জায়গা নয়...
ওগুলো এখানেই আছে... এই পৃথিবীতেই... এই শহরেই... এই রাস্তাতেই... কখনো কখনো একই দেওয়ালের দুই পাশে।
এক বাড়ির ছেলে নতুন মোবাইল একটু স্লো হলেই বিরক্ত হয়।
সামনের বাড়ির ছেলে অনলাইনে পড়ার জন্য মোবাইলই নেই বলে কাঁদে।
একজন মানুষ গরম জল পাঁচ মিনিট দেরি করে এলে অভিযোগ করে।
আরেকজন মানুষ আজ জল পেলেই যথেষ্ট ভেবে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেয়।
পার্থক্য শুধু পরিস্থিতিতে নয়...
পার্থক্য দৃষ্টিভঙ্গিতেও।
কেউ কেউ খারাপ পরিস্থিতেও হাসতে শিখেছে।
আর কেউ কেউ সব সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অভিযোগ থেকে বের হতে পারে না।
মানুষের সবচেয়ে অদ্ভুত অভ্যাস হল —
যা তার নেই তার হিসাব সে রোজ করে...
কিন্তু যা আছে তার হিসাব সে কখনো করে না।
প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে শুধু পাঁচটা জিনিস লিখে দেখুন —
আজ আমি নিঃশ্বাস নিচ্ছি।
আজ আমার কাছে খাওয়ার জল আছে।
আজ আমি খাবার পেয়েছি।
আজ আমার মাথার উপর ছাদ আছে।
আজ আমার মানুষগুলো আমার সাথে আছে।
হয়তো আপনার পুরো জীবনটাই বদলে যাবে।
হয়তো "স্বর্গ" কোনো জায়গা নয়... এটা একটা অনুভূতি!
ঠিক তেমনি "নরক"ও কোনো জায়গা নয়... সেই অনুভূতিটাকে ভুলে যাওয়াই নরক!
যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকা মানেই স্বর্গ।
যা পেয়েছি তা ভুলে শুধু অভিযোগে বাঁচা মানেই নরক।
মৃত্যুর পর কী হয় কেউ নিশ্চিত করে জানে না।
কিন্তু বেঁচে থাকতে থাকতেই আমরা এই সুন্দর পৃথিবী পেয়েছি, নিঃশ্বাস নেওয়ার বাতাস, খাওয়ার জল, খাবার, ভালোবাসার মানুষ, আর একটা বোতাম টিপলেই পাওয়া অসংখ্য সুবিধা।
এতকিছু থাকার পরও যদি আমরা সবসময় দুঃখেই থাকি...
তার চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর কী আছে?
হয়তো ঈশ্বর হেসে বলবেন —
"আমি তো তোমাকে স্বর্গেই রেখেছি... কিন্তু তুমি সেখানেও অভিযোগের অফিস খুলে বসেছ!"
তাই আজ থেকে অভিযোগ গুনবেন না...
"কৃতজ্ঞতা" গুণুন।
কারণ "কৃতজ্ঞতা" আছে যে হৃদয়ে, সেখানেই আসল স্বর্গ। 🙏💐🌷




