😊 সেদিন বিকেলে অফিস থেকে ফিরছিল অনির্বাণ। মেট্রো থেকে নেমে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে। চারপাশে মানুষে ভরা, অথচ সবাই যেন নিজের নিজের ছোট্ট একটা অদৃশ্য ঘরে বন্দী। কারও চোখে চোখ পড়ছে না, কারও মুখে কথা নেই।
হঠাৎ সামনে একটা দৃশ্য দেখে তার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল।
তখন সে ক্লাস সিক্সে পড়ে।
প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় মোড়ের মাথায় এক কাকু দাঁড়িয়ে থাকতেন। সাদা পাঞ্জাবি, হাতে বাজারের ব্যাগ।
যেদিনই দেখতেন, একই প্রশ্ন করতেন।
"কী রে, স্কুলে যাচ্ছিস?"
অনির্বাণ বিরক্ত হয়ে একদিন মাকে বলেছিল,
"মা, কাকুটা কী বোকা! স্কুল ড্রেস পরে আছি, ব্যাগ নিয়ে বেরিয়েছি, স্কুলে যাচ্ছি না তো কোথায় যাচ্ছি? রোজ এক প্রশ্ন!"
মা হেসে বলেছিলেন,
"ওটা প্রশ্ন না রে। ওটা কথা বলার অজুহাত।"
তখন সে বুঝতে পারেনি। বহু বছর পরে, আজ সে বুঝল।
কারণ আজকাল কেউ আর এমন প্রশ্ন করে না। লিফটে পাশাপাশি দাঁড়িয়েও মানুষ ফোন দেখে।
পাড়ায় নতুন কেউ এলেও পরিচয় হয় না।
কেউ কারও খোঁজ নেয় না, আবার সবাই বলে,
" মানুষ কেমন পাল্টে যাচ্ছে!! খুব একা লাগে। "
সেই দিন সন্ধ্যায় অনির্বাণ পার্কে হাঁটতে গিয়েছিল। হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করল, একটা ছেলে একা বেঞ্চে বসে আছে। স্কুল ড্রেস পরা। মুখটা কেমন যেন গম্ভীর।
অনেক প্রশ্ন মাথায় এলো,
স্কুল ড্রেসে সন্ধ্যাবেলা পার্কে বসে আছে কেন ছেলেটি??
টিউশন এ যাওয়ার ছিল হয়ত, কিন্তু পার্কে বসে আছে !
বাবা মা বকেছেন তাই কি রাগ করে এখানে বসে আছে?
কথা বলি? জিজ্ঞেস করি? জিজ্ঞেস করলে আবার 'personal space' এ ঢোকা হয়ে যাবে না তো? বলবে না তো, " অন্যের জীবন নিয়ে এত কৌতূহল কিসের?"
দুটো উল্টোপাল্টা উত্তর যদি দিয়ে দেয়!
থাক গে, পরের ছেলে, আমার কি!
অনির্বাণ একটু ইতস্তত করল।
আজকাল কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করাও কঠিন। কে কী মনে করবে! আরো এক রাউন্ড মেরে এলো অনির্বাণ। ছেলেটি ঠায় বসে আছে। সাহস করে বলেই ফেলল অনির্বাণ,
"কী রে, স্কুল থেকে ফিরছিস?"
মনে মনে প্রমাদ গুনল - সেই বোকা বোকা প্রশ্ন!!
ছেলেটা মাথা তুলল।
"হ্যাঁ।"
"কোন ক্লাস?"
"ইলেভেন"
তারপর দুজনেই চুপ।
অনির্বাণ ভাবল, এখানেই কথার শেষ। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরে ছেলেটাই বলল,
"আঙ্কেল, আপনি এখানে রোজ আসেন?"
"হ্যাঁ, প্রায়ই। যেদিন অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরি।"
"আমি মাঝে মাঝে আসি। বাড়িতে ভালো লাগে না।"
অনির্বাণ চমকে গেল। ছেলেটির পাশে বসল।
"কেন?"
ছেলেটা একটু চুপ করে বলল,
"বাবা-মা দুজনেই চাকরি করেন। আর কেউ নেই। ওদেরও দোষ নেই, সবাই ব্যস্ত। আমার কথা শোনার সময় কারও নেই।"
অনির্বাণ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
" বিশ্বকাপ খেলা হচ্ছে, খেলা দেখছিস??"
ছেলেটি মাথা নেড়ে বলল,
" সময় কই? স্কুল, টিউশন, তারপর হোমওয়ার্ক......."
অনির্বাণ কিছু বলল না। শুধু শুনতে লাগল।
প্রায় আধঘণ্টা ধরে ছেলেটা নিজের কথা বলে গেল।
স্কুলের চাপ।
বন্ধুদের সমস্যা।
ভবিষ্যতের ভয়।
একা লাগা।
সব।
বিদায় নেওয়ার সময় ছেলেটা হেসে বলল,
"থ্যাংক ইউ আঙ্কেল।"
"কিসের জন্য?"
"আজ অনেকদিন পরে কারও সঙ্গে কথা বললাম।"
" বন্ধু নেই?"
" আছে.. ওরাও ব্যস্ত।"
তারপর স্কুল ব্যাগটা হাতে নিয়ে চলে গেল।
ছেলেটির চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে অনির্বাণ হেসে ফেলল, কথোপকথনের শুরুটা কী দিয়ে হয়েছিল?
কোনও গভীর দর্শন দিয়ে নয়।
কোনও বড় উপদেশ দিয়ে নয়।
শুধু একটা " বোকা বোকা "প্রশ্ন দিয়ে।
"স্কুল থেকে ফিরছিস"?
কয়েক মাস পরে একদিন অনির্বাণ বাজারে যাচ্ছিল।
রাস্তার ধারে এক বৃদ্ধা ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন।
হঠাৎ তিনি হাসিমুখে বললেন,
"বাবা, অফিস থেকে ফিরছ নাকি?"
প্রশ্নটা শুনে অনির্বাণের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
আগের মতো হলে হয়তো মনে হতো,
"এ আবার কেমন প্রশ্ন!"
কিন্তু আজ সে বোঝে, বৃদ্ধা তার অফিস সম্পর্কে জানতে চাননি।
তিনি শুধু বলতে চেয়েছিলেন,
"আমি তোমাকে দেখেছি।"
"তুমি আমার কাছে অচেনা নও।"
"তোমার সঙ্গে দুটো কথা বলতে ইচ্ছে করছে।"
অনির্বাণ দাঁড়িয়ে গেল। দুজনের মধ্যে পাঁচ মিনিট কথা হলো।
আবহাওয়া নিয়ে।
বাজারের দাম নিয়ে।
পাড়ার পুরনো দিনের গল্প নিয়ে।
খুব সাধারণ কথা।
কিন্তু বাড়ি ফিরে অনির্বাণের মনটা অদ্ভুত ভালো লাগছিল।
আমরা আজকাল একাকীত্ব নিয়ে অনেক কথা বলি।
ডিপ্রেশন নিয়ে কথা বলি।
মানুষের দূরে সরে যাওয়া নিয়ে কথা বলি।
কিন্তু হয়তো ভুলে যাই, মানুষের কাছে যাওয়ার রাস্তা অনেক সময় খুব ছোট ছোট জায়গা থেকে শুরু হয়।
এই, একটা "কেমন আছো?"
একটা "কোথায় যাচ্ছ?"
একটা "আজ এত চুপচাপ কেন?" " কি রান্না করলে আজ?" " আজকাল দেখাই যায় না!"
হয়তো এগুলো সত্যিই বোকা বোকা প্রশ্ন।
কিন্তু অনেক সময় এই বোকা বোকা প্রশ্নগুলোই একজন মানুষকে মনে করিয়ে দেয়,
সে একা নয়। কেউ একজন অন্তত তার দিকে তাকিয়েছে।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে অনির্বাণ অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। সে, তার স্ত্রী আর তার ছেলে, তিনজন মানুষ একই ছাদের নীচে থাকে। তবু সকালে সবাই ব্যস্ত। দিনভর আলাদা।
রাতে যে যার ঘরে। ছেলের দরজা বন্ধ থাকলে সে সাধারণত নকও করে না।
মনে হয়, "ওর নিজের স্পেস আছে। বিরক্ত করব না।"
হয়তো এটাই আধুনিকতার নিয়ম।
কিন্তু সেই নিয়ম মেনে চলতে চলতে কখন যে মানুষ একে অপরের জীবন থেকে একটু একটু করে দূরে সরে যায়, সেটা কেউ টের পায় না।
সেদিন অনির্বাণ একটা সিদ্ধান্ত নিল। আগামীকাল থেকে অফিস থেকে ফিরেই সে একবার ছেলের ঘরে যাবে। কোনও গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার জন্য নয়। কোনও উপদেশ দেওয়ার জন্য নয়। শুধু একটা বোকা বোকা প্রশ্ন করার জন্য।
হয়তো বলবে,
"কী রে, পড়াশোনা হচ্ছে?"
অথবা,
"আজ স্কুলে কী খেয়েছিস?"
অথবা,
"এই যে, এতক্ষণ মোবাইলে কী দেখছিস?"
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো সে আগেই জানে। যে প্রশ্নগুলো শুনে ছেলেও হয়তো মনে মনে বলবে,
"বাবা কী সব বোকা বোকা প্রশ্ন করে!"
কিন্তু আজ অনির্বাণ জানে,
সব প্রশ্নের উদ্দেশ্য উত্তর জানা নয়।
কিছু প্রশ্নের উদ্দেশ্য হলো জানিয়ে দেওয়া,
"আমি তোমার পাশে আছি।"
"তোমার কথা শোনার সময় আমার আছে।"
"তুমি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।"
সেই রাতে অনেকদিন পরে অনির্বাণ নিজে থেকে ছেলের ঘরের দরজায় নক্ করলো।
ভেতর থেকে উত্তর এল,
"এসো বাবা।"
অনির্বাণ দরজা খুলে হেসে বলল,
"কী রে, আজ এত রাত পর্যন্ত জেগে আছিস কেন?"
ছেলে হেসে ফেলল।
"এটা আবার কেমন প্রশ্ন!
আমি তো রোজই দেরি করে ঘুমোই!"
অনির্বাণও হাসল।
হয়তো সত্যিই প্রশ্নটা খুব বোকা ছিল।
কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কথোপকথনগুলো অনেক সময় এমনই এক একটা বোকা বোকা প্রশ্ন দিয়েই শুরু হয়।
আজ যখন আমরা একাকীত্ব, মানসিক চাপ আর মানুষের দূরে সরে যাওয়া নিয়ে কথা বলি, তখন হয়তো সমাধানের শুরুটা খুব কঠিন কিছু নয়।
হয়তো আজই বাড়ি ফিরে নিজের মানুষটাকে একটা বোকা বোকা প্রশ্ন করে দেখুন।
হয়তো সে বিরক্ত হবে।
হয়তো হাসবে।
কিন্তু হয়তো সেই প্রশ্নটাই তাকে মনে করিয়ে দেবে,
"এই পৃথিবীতে এখনও একজন মানুষ আছে, যে আমার উত্তর শোনার জন্য অপেক্ষা করে।" ❤️
আজ থেকে চেষ্টা করি, রোজ একজনের সঙ্গে যেচেই কথা বলি।
****




